২১শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং | ৬ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | রাত ৯:৫৯

টেকসই উন্নয়নে সমবায়ের বৈশ্বিক ও স্বদেশী ভুমিকা

টেকসই উন্নয়নে সমবায়ের বৈশ্বিক ও স্বদেশী ভুমিকা
মোঃ ইসরাফিল আলম এম.পি

সমবায়ের সূচনা
সারা বিশ্বে সমবায় সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠিকে সামনে নেবার এবং তাদেরকে শোষণ ও বৈষম্য মুক্ত জীবন উপহার দেয়ার পরিক্ষীত পদ্ধতি হলো সমবায়। প্রতিটি সমবায় সমিতি হচ্ছে এক একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করত সহায়তা করে এবং ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে আদর্শ ও মুল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ সৃষ্টি করে। সমবায় সমিতি সমুহ কয়েকটি মৌলিক মুল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত যার মধ্যে গণতন্ত্র, সাম্য এবং সহমর্মিতা হচ্ছে অন্যতম। সমবায় সমিতি সমুহ হচ্ছে স্বশাসিত সংঙ্গবদ্ধ এবং স্বেচ্ছাপ্রনোদিত প্রতিষ্ঠান যার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় অগ্রগতিতে অবদান রাখা।

সমবায়ী উদ্যোগ
মানবতাবাদী ও গণমুখী অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন দারিদ্র বিমোচন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশের বিপর্যয় প্রতিরোধ এবং খাদ্য-নিরাপত্তার বলয় সৃষ্টিতে অন্যতম ও উৎকৃষ্ট পদ্ধতি হচ্ছে সমবায়ী উদ্যোগ। তাই সমবায়ী চেতনাকে অনুপ্রাণিত করতে নতুন উদ্দীপনা, সহযোগিতা, আইন ও বিধিমালা সহজ করে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয়া দরকার। যেমনটি লক্ষ্য করা যায় জার্মানী, ডেনমার্ক, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড অথবা অষ্ট্রোলিয়ার মতো উন্নত বিশ্বে। এ সকল দেশে সমবায় অঙ্গনে বৃহৎ পুঁজির অনুপ্রবেশের ফলে সমবায় সমিতি সমুহ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে এবং বিশ্ব বাজারে দৃঢ় স্থান করে নিয়েছে।

সমবায় একটি মডেল
একটি কথা ভুললে চলবে না, পুঁজিবাদী ব্যক্তিমালিকানা বা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় মালিকানা উভয়ের যেসব ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সমবায় একটি মডেল হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ অনেক বেশী। আর্থ সামাজিক অগ্রগতিতে, গণতান্ত্রিক চিন্তা চেতনার বিকাশে এবং সমাজে সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার পরিবেশ সৃষ্ঠিতে সমবায় সমিতি সমুহকে অবদান রাখার সুযোগ দিতে হবে। প্রকল্প ভিত্তিক উন্নয়নের পরিকল্পনা কোন স্থাপনা বা অবকাঠামো নির্মাণে সহায়ক। কিন্তু জনগণের সম্পৃক্ততা লাভের মাধ্যমে সামাজিক মালিকানার গ্রহণযোগ্যতা অর্জন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রগতির “রূপকল্প” বাস্তবায়নে সমবায় হচ্ছে অন্যতম পদ্ধতি।

সমবায়ের সামাজিক দায়বদ্ধতা
সংঘবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়িত্ব (Corporate Social Responsibility) একটি নতুন চিন্তাধারা যা ব্যবসা পরিচালনায় সামাজিক মুল্যবোধকে মূখ্য বিষয় হিসাবে বিবেচনা করে থাকে। সামাজিক আর্থিক সাফল্যের সাথে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে দৃশ্যমান করে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে অবদান রাখতে পারে একমাত্র সমবায় সমিতি সমূহ। সমবায় সমিতি সমূহ তাদের উৎপাদন, ব্যবসায়িক লেন-দেনে নৈতিকতা ও মানবাধিকার বজায় রাখা ছাড়াও ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণ, সুবিধাভোগীদের চাহিদা পুরণ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা প্রদান, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।

বিশ্বব্যাপী সমবায়
বাংলাদেশে সমবায়ের শতবর্ষ উৎযাপন উপলক্ষে আন্তর্জাতিক সমবায় মৈত্রীর প্রেসিডেন্ট মি: ইভানো বারবেরিনী অভিমত প্রকাশ করেন যে ‘বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলন সমবায়ের কর্মকান্ডকে সামাজিকভাবে দৃশ্যমান করে উন্নত বিশ্ব গঠনের উদ্যেগে যে সাফল্য প্রদর্শন করেছে তাকে আমি প্রশংসা করি’। সতিকথা হচ্ছে বাংলাদেশে সমবায় পদ্ধতি হচ্ছে শত বছরের অধিক সময়ের অনুসৃত একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া যা অনেক পরীক্ষার মাঝেও স্বগৌরবে মাথা উঁচু করে টিকে আছে অনেক অসম প্রতিযোগিতার মাঝে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ সমবায়ের মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ করে। বিশ্বের ৩০০টি সমবায় প্রতিষ্ঠানের সম্পদের পরিমাণ ৩০-৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক সমবায় মৈত্রীর হিসাব অনুসারে কানাডা, জাপান ও নরওয়েতে প্রতি ৩ জনের ১ সমবায়ী। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ও জার্মানীতে প্রতি ৪ জনের একজন সরাসরি সমবায়ের সাথে সম্পৃক্ত। গণচীনে ১৮০ মিলিয়ন, ভারতে ২৩৬ মিলিয়ন, মালয়েশিয়ায় ৫.৪ মিলিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৯.৮ মিলিয়ন জনগণ সমবায়ের সদস্য। জাপানে কৃষিকাজে নিয়োজিতদের ৯০ শতাংশ সমবায়ী। বেলজিয়ামে সমবায়ের মালিকানায় পরিচালিত ঔষধ শিল্প বাজারে ১৯.৫% শেয়ার অধিকার করে আছে। ব্রাজিলে সমবায় সমিতি সমূহ কৃষিতে ৪০% এবং কৃষিজাত পণ্য রপ্তানীতে ৬% অবদান রাখচে। কানাডার সমবায় সমিতি সমূহ বিশ্বের ৩৫% ম্যাপেল সুপার উৎপাদন করে। কেনিয়ার ৪৫% দেশজ উৎপাদন এবং ৩১% জাতীয় সঞ্চয় সমবায় সমিতি সমুহ থেকে আসে। তেমনিভাবে কোরিয়ার প্রায় ৯০% খামার চাষী কৃষি সমবায়ের সদস্য এবং প্রায় ৭১% মাছের বাজার মৎস্যখাতে সমবায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করে। ডেনমার্ক ও নরওয়ের ৯৫% দুধ উৎপাদন ও বাজার জাত করে সমবায়ীরা।

বাংলাদেশ সমবায়
বাংলাদেশে ১৯০৪ সালে কৃষি ঋণ সমবায় সমিতি আইন, ১৯১২ সালের কো. অপারেটিভ সোসাইটি এ্যাক্ট, ১৯৪০ সালের বেঙ্গল কো. অপারেটিভ এ্যাক্ট, ১৯৫৬ বার্ড, ১৯৭৩ আইআরডিপি, সমবায় সমিতি অধ্যায়দেশ ১৯৮৪, সমবায় সমিতি বিধি মালা ১৯৮৭, সমবায় সমিতি আইন, ২০০১ ও ২০০২, বিধি মালা ২০০৪, জাতীয় সমবায় নীতিমালা ২০১৩ ও আইন-২০১৩ এর দ্বারা নীতি ও আইন কাঠামোর সংস্কার করা হলেও সমবায় আইন পুন:সংশোধন ও যুগোপযোগী করণের প্রয়োজন রয়েছে। সমবায় আন্দোলন তার নিজস্ব নীতি ও গতিতিতে ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পারেনি, তবে বাংলাদেশে এই সেক্টরে সফলতার কাহিনী অপ্রকাশিত রয়েছে যুগযুগ ধরে।

সমিতির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আর্থ সামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্ঠি, মহিলাদের ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বিধান এবং সর্বোপরি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন। বাংলাদেশে প্রধানত ২৯ ধরণের সমবায় সমিতি আছে, যার মধ্যে কৃষি, মৎস্য ও পশু পালন, গৃহায়ণ, পরিবহন, দুগ্ধ উৎপাদন, ঋণ ও সঞ্চয় এবং ক্ষুদ্রঋণদান কর্মসূচী পরিচালনা হচ্ছে উল্লেখযোগ্য। সমবায় সমিতির সংখ্যা প্রায় ১,৮৬,১৯৯টি যার সদস্য সংখ্যা প্রায় ৯৩ লক্ষ ৫০ হাজার। এর মধ্যে জাতীয় সমবায় সমিতি ২১টি, কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি ৪৫৯টি এবং অবশিষ্ঠ হচ্ছে প্রাথমিক সমবায় সমিতি। এ সকল সমিতির মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন ও বিতরণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। সমবায় সমিতির সমুহের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ মহিলা সমবায় সমিতি। সমবায়ে মহিলাদের অবদান উল্লেখযোগ্য, তাদের বিচরণ অবারিত ও দৃশ্যমান, যেমন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড সমর্থিত সমিতিতে, তেমনিভাবে সমবায় অধিদপ্তর কর্তৃক নিবন্ধিত সমিতির তালিকায়।

টেকসই উন্নয়ন এবং রিও ২০+ ঘোষণা
আন্তর্জাতিক কো-অপারেটিভ এল্যায়েঞ্চ এর ২০১৪ সালের ঘোষণা হচ্ছে, সমবায় প্রতিষ্ঠান সমূহ টেকসই উন্নয়ন অর্জনে সক্ষম। টেকসই উন্নয়ন বলতে আমরা কি বুঝি? ১৯৮৭ সালে টেকসই উন্নয়নের যে সংজ্ঞা দেয়া হয় এবং তাতে উল্লেখ্য করা হয়, ‘ভবিষৎ প্রজন্মের নিজস্ব চাহিদা পুরণের দক্ষতাকে আপোষ না করে যে উন্নয়ন বর্তমানের চাহিদা পুরণ করতে সক্ষম তাই হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন’। ইংরেজীতে বলা হয়েছে, Deveiopment that meets the need of the present without compromising the ability of future generation to meet their own needs.

ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে ২০১২ সালে জুন মাসে ১৯২টি দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রিও+২০ ঘোষণা গৃহীত হয়। ১৯৯২ সালে এখানেই ধরিত্রী সম্মেলন (Earth summit) হয়েছিল এবং তার বিশ বছর পর পুনরায় এমন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে এর নাম রিও+২০ হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছে। যে দলিলে এ ঘোষণা আসে তাতে বলা হয় ‘আমরা কেমন ভবিষৎ চাই’ (The future we want)” । বাস্তবে একটি তালিকা প্রণয়ন করা হয় যাতে বলা হয় টেকসই অর্থনীতি এবং দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে প্রত্যেক দেশ সবুজ অর্থনীতি অর্জন করবে এবং এ লক্ষ্যে তাদের জাতীয় নীতিমালা ও প্রাধিকার বিবেচনা করবে। তবে তিনটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে হবে তা হচ্ছে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশ সংরক্ষণ। তবে জাতিসংঘের অধিবেশনে রিও+২০ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ৩০ সদস্যের অপেন ওর্য়াকিং গ্রুপ গঠন করা হয় যারা ( Sustainable Development Goals-2015) এর বিভিন্ন বিষয় ও প্রাধিকারসমুহ চিহ্নিত করবে।

টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য
মোটামুটিভাবে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১২টি এজেন্ডাকে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য হিসাবে চিহ্নিত করেছে। লক্ষ্য হলো: ১) দারিদ্র বিমোচন, ২) মহিলাদের ক্ষমতায়ন এবং লিঙ্গ সমতা, ৩) গুনগত শিক্ষা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষা, ৪) স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ৫) খাদ্য নিরাপত্তা ও উত্তম পুষ্ঠি, ৬) সর্বজনীন পানি প্রাপ্তি ও পরিচ্ছন্নতার সুযোগ, ৭) স্থিতিশীল বিদ্যুৎ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, ৮) কর্মের সুযোগ, জীবিকার নিশ্চয়তা এবং সমদর্শী উন্নয়ন, ৯) প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা, ১০) সুশাসন এবং দক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, ১১) স্থিতিশীল এবং শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা, ১২) বিশ্বজনীন ভালো পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক উন্নয়ন।

সহস্রাব্দের উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে সাফল্য
লক্ষ্যনীয় যে ২০১৫ সাল অবধি সহ¯্রাব্দের উন্নয়নের ৮টি লক্ষ্য নির্দ্বারণ করা হয়েছিল। এই ৮টি লক্ষ্য হচ্ছে ১) চরম দারিদ্র ও ক্ষুধা নিবারণ, ২) সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, ৩) মহিলাদের ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ সমতা অর্জন, ৪) শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, ৫) মাতৃ স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, ৬) এইচ আই ভি এইড/এইডস ও ম্যলেরিয়া প্রতিরোধ, ৭) পরিবেশের স্থিতিশীলতা অর্জন, ৮) বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা।
এই ৮টি লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বব্যাপী অভিনন্দিত হয়েছে। বিশেষ করে ৪,৫,৬ এর লক্ষ্য ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে এবং অপরাপর সকল লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন-ট্রাক বা সুবিদিত পথে পদাচারণা করে প্রশংসনীয় সাফল্য ও স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্র ২০১৫-২০৩০
জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত ১৭টি সুনির্দিষ্ট টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে মধ্যে সমবায়ের সাথে সম্পর্কিত লক্ষ্যমাত্র গুলোহলো: ২) ক্ষুধা দুরীকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন এবং পুষ্টির উন্নয়ন ও কৃষির টেকসই উন্নয়ন প্রবর্তন করা ,৮) স্থিতিশীল ও অংশগ্রহণ মুলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং পূর্ণকালীণ উৎপাদনমুলক কর্মসংস্থানসহ উপযুক্ত কাজের পরিবেশ তৈরী করা, ১০) রাষ্ট্রেসমূহের অভ্যন্তরীণ ও বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যকার বৈষম্য বিলোপ করা, ১২) উৎপাদন ও ভোগ কাঠামোর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

উক্ত লক্ষমাত্রা সমুহকে অর্জন করতে সমবায় পদ্ধতির প্রয়োগ, অনুশীলন ও সফলতার অর্জনে বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

এমডিজি এর সাফল্য বাংলাদেশকে অনুপ্রানিত করেছে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে সাহস ও উদ্দীপনার সঞ্চয় করতে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি হচ্ছে ‘দেশের মাটি থেকে উত্থিত উন্নয়ন দর্শন’ (Home grown development philosophy)। এ আদর্শকে অনুসরণ করে অগ্রগতির পথে ধাবিত হচ্ছে দেশ। দেশের সামনে লক্ষ্য হচ্ছে সবার জন্য সমানভাবে অর্থনৈতিক সুযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা বিধান, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, কর্ম সম্পাদনে স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা এবং সকল স্তরে সুরক্ষা বিধান। মানব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এবং সকল স্তরের ও ধর্মের অনুসারী জনগণের মানবাধিকার সুরক্ষার প্রয়োজনে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয় বাড়াতে হবে এবং সকল জনগোষ্ঠির মাঝে তার সুফল পৌছাতে হবে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে হয়েছে ইউএস ডলার ৩০ বিলিয়ন যা সর্বোচ্ছ রেকর্ড। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্ঠি হয়েছে অনেক। বাংলাদেশ বিশ্বায়নের রথযাত্রার সহযাত্রী। অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, ‘সমৃদ্ধির নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশ; উন্নয়নের ধারাবাহিকতা’। প্রবৃদ্ধি ৭ এর উপরে অর্জিত হয়েছে। রেমিট্যান্স ১৫ বিলিয়ন, মাধাপিছু আয় প্রায় ১৪০০ ডলার, গড় আয়ু বৃদ্ধি, ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্ঠনি সম্প্রসারিত হয়েছে ব্যাপক। শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা সর্বস্তরের জনগণের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে।

বৈষম্য নিরসনে সমবায়
দেশের অর্থনীতি ও সমাজের সুষ্ঠু অগ্রগতির লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই। কোন প্রকার কসমেটিক বা স্বল্পমেয়াদি বা আমদানি নির্ভর সাময়িক উন্নয়ন টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারেনা। বৈষম্য নিরাসন, সকলের জন্য ন্যায়্যভাবে সামাজিক সুবিধাদি নিশ্চিতকরণ এবং সুবন্টিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মৌলিক উপাদান। আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্য আমাদের অর্থনৈতিক পথে প্রধান অন্তরায়। সুইজ ব্যাংকে বছরে প্রায় ৬৪০০ কোটি জমা হচ্ছে এবং ওয়াশিংটন ভিক্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়েল ইন্টেগ্রিটিার (জিএফআই) তথ্য মতে, বাংলাদেশ থেকে বছরে পাচার হাওয়া অর্থের পরিমাণ উদ্বেগজনক । অবৈধভাবে আহরিত এ অর্থ দেশে নির্বিঘেœ ব্যবহার করতে না পেরে তা পাচার করা হচ্ছে, অথচ হত দরিদ্র লোকের সংখ্যা হ্রাসের লক্ষ অর্জন দূরহ হচ্ছে, আইলা-সিডর-মঙ্গা-চর-হাওর-বাওর এলাকার ভুমিহীন ও প্রান্তিক চাষীদের ক্রয়ক্ষমতা ও সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। এ হচ্ছে বড় ধরণের সামাজিক বৈষম্য এবং টেকসই অর্থনীতির প্রতি চ্যালেঞ্জ। সমবায়ী বিনিয়োগ এবং সমবায় সমিতির মাধ্যমে এমনটি প্রায় অসম্ভব।

সমবায়ের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন
সমবায় সমিতি কোন ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নয়। সমিতিতে শেয়ার ক্রয় করে মুনাফা অর্জন করা সমবায়ীদের প্রধান লক্ষ্য নয়। সাতটি মৌলিক নীতিমালা উপর নির্ভর করে সমবায় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে, সেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ, উন্মুক্ত সদস্য হওয়ার সুযোগ, শিক্ষা প্রশিক্ষণ, তথ্য বিনিময় এবং সমাজকে সম্পৃক্ত করে উন্নয়ন হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য। সমবায়ের সংজ্ঞা দেখলেই তা পরিষ্কার হতে বাধ্য। A co-operative is defined as an autonomous association of people united voluntarily to meet their common economic socil and cuitural needs and aspiration through jointly-owned and democraticaiiy economic, social and cultural needs and aspiration through jointly-owned and democratically controlled enterprises, সহজভাবে বলা যায় ‘সমবায় হচ্ছে সমমনা মানুষের স্বেচ্ছাসেবামুলক একটি স্বশাসিত সংগঠন যা নিজেদেরকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে এবং এ লক্ষ্যে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা পরিচালনা করে’। অধ্যাপক এম এম আকাশের মতে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে সমবায় মডেল হচ্ছে, ‘নমনীয় কিন্তু সৃশৃঙ্খল, গণতান্ত্রিক কিন্তু বির্তক ক্লাব নয়। বাজার ভিত্তিক কিন্তু পরিকল্পনা শুন্য নয়, ব্যাক্তি উদ্যোগে বিশ্বাসী কিন্তু স্বেচ্ছাচারিতায় নয়’।

টেকসই উন্নয়নের যে ১২ টি লক্ষ্য উপরে উল্লেখ করা হয়েছে ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে সমবায় সমিতি সমুহ প্রতিটি ক্ষেত্রে অনবদ্য অবদান রাখতে সক্ষম। এসকল সমিতি তাদের সদস্যদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং ব্যক্তির সম্পদের ঝুঁকিকে সমিষ্ঠিগতভাবে গ্রহণ করে তার নিরাপত্তা বিধান করে। মহিলাদের ক্ষমতায়ন, গুণগত শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তার লক্ষ্যে গ্রামীণ জনপদে ক্ষুদ্র ও বর্গা চাষীদেরকে সহায়তা করা, হাঁস-মুরগী পালন ও মাছ চাষ এর মাধ্যমে অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। সমবায়ের প্রশাসনে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা হচ্ছে দৃশ্যমান টিকসই উন্নয়নের পাথেয়। সমবায় সমিতি ‘সামাজিক মুলধন’ সৃষ্ঠি করতে সক্ষম যা জিডিপি’তে অমুল্য অবদান রাখতে পারে।
বাংলাদেশে যে সকল সমবায় সমিতি আছে তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন থেকে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করে আসছে। শুধুমাত্র ঢাকা জেলায় ২০০ সফল সমবায় সমিতি আছে যাদের অনেকের অবদান অসামান্য। বাংলাদেশ পুলিশ কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি:, বারিধারা মহিলা সমবায় সমিতি লি:, সম্প্রীতি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লি:, ঢাকা সংবাদপত্র হর্কাস বহুমুখী সমিতি লি: ইত্যাদি টেকসই উন্নয়নের পথে পরীক্ষিত সমিতি হিসাবে আতœপ্রকাশ করেছে। এছাড়া ঢাকার বাইরে আছে অগণিত সমবায় সমিতি যারা দারিদ্র বিমোচন ও ক্ষমতায়নে ইতিহাস রচনা করেছে। কুমিল্লার দিদার কো-অপারেটিভ সমিতি মাত্র ৯ আনা মুলধন থেকে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ সৃষ্টি করে সমবায়ের চেতনাকে সার্বজনীন করার ইতিহাস রচনা করেছিল।

সুশাসন সমবায়ের বড় চ্যালেঞ্জ
শত বছরের অধিক একটি আন্দোলন বাংলাদেশ কৃষি ও অকৃষি খাতে স্বনির্ভর ও টেকসই অর্থনীতি গঠনের একটি বিপ্লবের সুচনা করেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এবং ডঃ আখতার হামিদ খান এ ভুখন্ডে সমবায়ের যে চেতনার সুচনা করেছিলেন বর্তমানে তার অবক্ষয় হয়েছে। সরকার বিসিএস (সমবায়) কর্মকর্তাদেরকে অন্যান্য কাডারের অনুরূপ তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও সাধারণ প্রশাসনের উচ্চপদে পদায়নের সুযোগ সৃষ্ঠি করেছে। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের বরাবরে সরকার বাজেটের পরিমান প্রতি বছরই বৃদ্ধি করছে এবং ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্প গ্রহণ করে সমবায়ের আদর্শকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে সমবায়ের আদর্শকে জাগ্রত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সমবায় আন্দোলন আশানুরূপ ভাবে অগ্রগতি লাভ করেনি এবং সুশান দৃশ্যমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কারণ সমবায় সমিতির ব্যববস্থাপনা কমিটি গঠন, নিরীক্ষা, বিরোধ নিষ্পস্তি, অবসায়ন, উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ, অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও দলীয়করণ এবং অসমবায়ীদের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করে আদর্শ ভিত্তিক সমবায় প্রতিষ্ঠান গঠনে সমবায়ের কর্মকর্তারা আশানুরূপ দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেনি। জনগণ সমবায়কে একটি অর্থবহ খাত হিসাবে মনে করে না এবং এখাতে বিনিয়োগের আকর্ষন বোধ করে না। সমবায় খাতে সুশাসনের অভাব এবং নিয়ম বিধির চরম জটিলতা আছে বলে মনে করেন। ষাটের দশকের সমবায় আন্দোলন এখন মৃত, এমন ধারণা অনেকের মনে লুকায়িত থাকলেও গণমাধ্যমে সমবায় সমিতি সম্পর্কে কোন সুখবর প্রকাশ পায়না- এই সত্যটি বিবেচনার দাবি রাখে। সমবায় খাতে আর্থিক সহায়তা, পুঁজি বিনিয়োগ, সুদ হ্রাস, সমবায়ীদের আমানত ও সঞ্চয়ের অর্থ ফেরত প্রাপ্তির অনিশ্চিয়তা এই খাতের গতি ও কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তবে সমবায়ীদের ভূতুকি বাবদ বর্তমান সরকারের প্রদত্ত ৪২৫ কোটি টাকার সহায়তা এই খাতকে দৃশ্যমানভাবে পুন:জীবিত করছে।

সমবায়ের সক্ষমতা ও কার্যকরীতা বৃদ্ধিতে ‘আইসিএ’ নির্ধারিত ৭টি নীতি: ১) স্বত:স্ফুর্ত এবং অবাদ সদস্যপদ, ২) গণতান্ত্রিক সদস্য নিয়ন্ত্রণ, ৩) সদস্যের আর্থিক অংশগ্রহণ, ৪) স্বায়িত্বশাসন ও স্বাধীনতা, ৫) শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং তথ্য, ৬) আন্ত: সমবায়ের সম্পর্ক ও ৭) সামাজিক সম্পৃক্ততা। এই নীতিমালা গুলোকে সমবায়ীদের পথের হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ
টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি ছাড়া উন্নয়ন স্থায়ী হয় না। টেকসই উন্নয়ন সুনিশ্চিত করতে হলে ‘দেশজ সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা’ কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ সম্পদ হচ্ছে মানব সম্পদ, ভৌত সম্পদ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ। জনসংখ্যাকে রূপান্তরিত করতে হবে জনসম্পদে, যেখানে বিনিয়োগ করতে হবে শিক্ষায়, জনস্বাস্থ্যে, জনগণের দক্ষতা বৃদ্ধিতে। সব ধরণের ভৌত অবকাঠামো, রাস্তাঘাট, ব্রীজ কাল-ভার্ট নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হলে প্রয়োজন জনগণের ব্যাপক সমর্থন এবং সমন্বিত উদ্যোগ যা সম্ভব সমবায়ের মাধ্যমে। প্রাকৃতিক সম্পদ জমি-জলা-জঙ্গল হচ্ছে দেশ সম্পদ, যার উন্নয়ন জনগণের সমর্থন ছাড়া অসম্ভব এবং সেখানেই সমবায়ের ভূমিকা অসামান্য। বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানী করে মুল্য সংযোজনের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করা যায় কিন্তু টেকসই অর্থনীতি গড়ে উঠেনা। জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া ভুমি কৃষি জলা সংস্কার যেমন টেকসই হয়না, তেমনিভাবে ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগসহ আতনকর্মসংস্থান বিকশিতকরণের এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সমবায়ী উদ্যোগ।
‘বাংলাদেশের সম্ভাবনা অপরিমেয়’ এ সত্যকে বাস্তবায়ন করতেহলে দুটি বিষয়কে জোর দিতে হবে। প্রথমত: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসসেই হবে। দ্বিতীয়ত: সকল কর্মকান্ডে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই। অর্থমন্ত্রী এবারের বাজেট বক্তৃতায় ‘এদেশের জনগণকে সাথে নিয়ে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি প্রযুক্তি নির্ভর সুখী, সমৃদ্ধ ও কল্যাণকামী দেশ গঠন’ এর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এ জাতীয় আশাবাদকে ফলপ্রসু করতে হলে সমবায়ের মুলনীতি যেমন সাম্য, একতা, সহযোগিতা, সততা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রয়োগ হতে হবে সকল উন্নয়নের পদক্ষেপে।
আন্তর্জাতিক কো-অপারেটিভ এল্যায়েন্স ৯২তম আর্ন্তজাতিক সমবায় দিবস উপলক্ষে আহবান জানিয়েছে সমবায়কে টিকসই উন্নয়নের নির্মাতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
The co-operative secter needs to explain and show to the world that sustainibility is part of its intrisic nature,and that co-operative enterprises make a positive contribution to sustainibility.

সংক্ষেপে বলতে হয় যে সমবায়ের ভাবমুর্তি পুনরুদ্ধার করার কোন বিকল্প নেই। সমবায় খাতের বর্তমান অবক্ষয়ের প্রধান কারণ হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা, অনিয়ম ও দুর্নীতি যা নিবন্ধন, নিরীক্ষা, তদারকিসহ অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হচ্ছে। সমবায় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অদক্ষতার অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে বারবার যা হচ্ছে অনভিপ্রেত। সমবায় এর সুফল এবং তার টেকসই উন্নয়নের সুযোগ সম্পর্কে জনগণকে সঠিকভাবে অবহিত করার উদ্যোগ সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে আশানুরূপভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে না। তদারকির দুর্বলতা এবং পরোক্ষভাবে নীরবতার কারণে সমবায় সমিতির মধ্যে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে যার প্রতিকার অত্যন্ত জরুরী। এই প্রেক্ষাপটে, টেকসই উন্নয়নের রূপকার হিসাবে সমবায়কে প্রতিষ্ঠিত ও উজ্জীবিত করতে হলে নিমোক্ত কয়েকটি পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরী বলে প্রতীয়মান হয়:-
১) সমবায়ী চেতনাকে বিকাশের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় বাজেটে সমবায় খাতের জন্য অর্থের সংস্থান থাকতে হবে। বাজেটে সমবায়ের চেতনা বিকাশে বক্তব্য থাকতে হবে এবং অর্থায়ন করতে হবে। সরকারের আর্থিক সংশ্লেষ থাকলে তদারকির সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।
২) সমবায় খাতে ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সমবায়ের ভাবমুর্তি বিকশিত হবে না এবং জনগণের আস্থা অর্জন ও সহযোগিতা সম্ভব হবে। সরকারী কর্মকর্তাদের জন্য প্রযোজ্য আচরণবিধি এবং শৃঙ্খল ও আপীল বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। জরুরীভাবে সকল শৃঙ্খলা জনিত বিভাগীয় মামলার সুরাহা করা প্রয়োজন।
৩) তালিকাভূক্ত প্রায় ৪৭% সমিতি অকার্যকার আছে যা দীর্ঘদিন চলতে দেয়া যায় না। একটি ক্রাস প্রোগ্রামের মাধ্যমে এর সুরাহা করতে হবে এবং প্রতি ৫ বছর অন্তর সচল সমবায়ীদের তালিকা প্রণয়ন করতে হবে।
৪) সমবায়ের সকল কর্মকান্ড ডিটিটালাইজড করতে হবে এবং হিসাব-নিকাশ নিরীক্ষার সুবিধার্থে একক সফটওয়ার ব্যবহার করতে হবে।
৫) জেলা, উপজেলা পর্যায়ে কর্মশালা, প্রশিক্ষণ কোর্স এর আয়োজন করে সমবায় চেতনাকে বিকশিত করতে হবে এবং তাতে গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
৬) ‘গবেষণা ও প্রচারণা’ নামে একটি অতিরিক্ত নিবন্ধকের অধীনে পৃথক বিভাগ খুলতে হবে। তিনিই নিয়মিত ত্রৈমাসিক মনিটরিং এর আয়োজন করবেন।
৭) নিয়ম বর্হিভূত কর্মকান্ডে জড়িত বা প্রতারণা করছে এমন সব সমিতি বাতিল সাসপেন্ড করে তদন্ত শুরু করতে হবে এবং দোষীদেরকে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।
৮) ২০১৩ সালের সমবায় আইনে কিছু অস্পষ্টতা ও সমবায়ী স্বার্থবিরোধী ধারা আছে যা অপসারণ করতে হবে।
৯) গণমাধ্যমে সমবায়ের সফলতার কাহিনী ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*